রাত ১:৪৭ রবিবার ৩০শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

হোম দেশ কম বয়সী তরুণীদের দুবাই নিয়ে দেহব্যবসায় বাধ্য করতো তিন ভাই

কম বয়সী তরুণীদের দুবাই নিয়ে দেহব্যবসায় বাধ্য করতো তিন ভাই

লিখেছেন মামুন শেখ
কম বয়সী তরুণীদের দুবাই নিয়ে দেহব্যবসায় বাধ্য করতো তিন ভাই-durantodb.com
Spread the love

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ছেরে আজম খান ১৯৯৬ সালে দুবাইয়ে পাড়ি জমান। একই পথ ধরে যান তার আরো দুই ভাই দুবাই যান। আর তার বাবা আগে থেকেই দুবাই থাকতেন। সেখানে তিনটি ৪ তরকা এবং একটি ৩ তারকা হোটেলের অন্যতম মালিক আজম। হোটেলগুলো হলো- ফরচুন পার্ল হোটেল এন্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়েল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্রান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ার। দুবাই বসেই আজম খানরা তিন ভাই নারী পাচার আর দেহব্যবসার স্বর্গরাজ্য গড়ে তোলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আজম খানকে ধরতে সক্ষম হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি।

রোববার (১২ জুলাই) ব্রিফিংয়ে সিআইডি জানায়, সব সময়ই দেশীয় দালাল এবং মধ্যম সারির পাচারকারীদের ধরা হলেও এই প্রথম কোন সিন্ডিকেটের হোতাকে ধরা হলো।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগের উপমহাপরিদর্শক ইমতিয়াজ আহমেদ সিআইডির সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে জানান, আজম খান একজন গডফাদার। সারা দেশ থেকে দালালের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করতেন আজম। তাদের হোটেলে কাজ দেয়ার কথা বলে জোর করে ড্যান্সবার ও যৌনকর্মে বাধ্য করা হতো। এভাবে সহস্রাধিক নারীকে কাজ দেয়ার নামে যৌনকর্মে বাধ্য করার অভিযোগে তাকেসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তার অপর দুই সহযোগী হলেন আল আমিন হোসেন ওরফে ডায়ামন্ড ও আনোয়ার হোসেন ওরফে ময়না।

১০ হাজার টাকার লোভে অন্ধকার জগতে তরুণীদের ঠেলে দিতো দালালরা:

সিআইডি জানায়, সারা দেশে আজম খানের ৫০ জনের মতো দালাল আছে। তারা ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণীদের টার্গেট করে। দুবাইয়ের অভিজাত হোটেলে ওয়েট্রেস, ক্লাবে নৃত্য শিল্পীর কাজ দেয়ার কথা বলে তাদের প্রলুব্ধ করতো। মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন দেয়ার কথা বলতো তারা। এমনকি আস্থা অর্জনের জন্য বেতনের অগ্রিম হিসেবে যাওয়ার আগেই টাকা দেয়া হতো। আর এভাবেই তাদের ফাঁদে ফেলতো। একেক জন তরুণীকে পাচারের জন্য দেশীয় দালালরা পেতো মাত্র ১০ হাজার টাকা করে।

দেহ ব্যবসায় রাজী না হলেই ইলেকট্রিক শক:

ব্রিফিংয়ে সিআইডি জানায়, দুবাইয়ে নিয়ে প্রথমে হোটেলে ছোটখাটো কাজ দেয়া হতো তরুণীদের। পরে আটকে রেখে ড্যান্স বারে নাচতে এবং এক পর্যায়ে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হতো। আর এতে কেউ রাজি না হলে ইলেকট্রিক শকের মতো ভয়াবহ নির্যাতন নেমো আসতো।

জড়িত দুই আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স:

পনের কুড়ি বছরের তরুণীদের পাচার করা হতো ট্যুরিস্ট ভিসায়। এতো কম বয়সী নারীদের পর্যটক হিসেবে দুবাইয়ে যাওয়ার অস্বাভাবিক কাজটি বাস্তবায়ন করতো দুটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ও তাদের এজেন্টরা। তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম নিতে নারাজ সিআইডি।

যেভাবে গ্রেফতার হলো আজম খান?

ব্রিফিংয়ে সিআইডি আজম খানের গ্রেফতার হওয়ার সুনির্দিষ্ট দিন ক্ষণ জানায়নি। তবে তারা বলছে, এ বছরের শুরুর দিকে আরব আমিরাত সরকার আজম খানের অপরাধের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানায়। দূতাবাস আজম খানের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে। পরে সেদেশের সরকার দূতাবাসের দেয়া এক্সিট পাস দিয়ে আজম খানকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। দেশে ফেরার পর গা ঢাকা দেয় আজম। তবে তার পিছু নেয় সিআইডি। এক পর্যায়ে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় তারা।

এয়ারপোর্টেই কেনো গ্রেফতার করা হলো না? এ প্রশ্নের উত্তরে সিআইডি বলছে, আজমকে দেশে পাঠানোর সংবাদ তারা জানতো না। জানলে তখনই গ্রেফতার করা যেতো। তবে পরে দূতাবাস আজমকে ধরতে নানা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

দেশে আছে পনের মামলা, সিন্ডিকেট বিস্তৃত ভারত পাকিস্তানেও:

সিআইডি জানায়, ৮ বছর ধরে নারী পাচার ব্যবসা করছেন আজম খান। এ জন্য তিনি সেদেশে এক মাস জেলও খেটেছেন। তবে ১৯৯৬ সাল থেকে দুবাইয়ে থাকলেও দেশে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ১৫টি মামলা। তার মধ্যে ৬টি হত্যা মামলাও রয়েছে। তবে মামলাগুলোর বিস্তারিত জানায়নি সিআইডি।

সিআইডি জানিয়েছে, দুবাইয়ে থাকা আজমের দুই ভাই এখন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া সিন্ডিকেটে ভারতের দুই জন এবং পাকিস্তানের কয়েকজন নাগরিকও জড়িত। আজমের দুই ভাইকে দেশে ফেরাতে আরব আমিরাত সরকারকে অনুরোধ জানানো হবে। সিআইডি আরো বলছে, নানা দেশের নাগরিকরা সিন্ডিকেটে থাকলেও আজম খানই গডফাদার। কারণ নীতি ও কৌশল নির্ধারণ আর বাস্তবায়ন হতো আজম খানের নেতৃত্বে।

দুবাইয়ে চারটি অভিজাত হোটেলের মালিকানার অংশীদার হতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সিআইডি বলছে, দেশ থেকে এ জন্য অর্থ পাচার হয়েছে কি না তা এরইমধ্যে খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।

এ ঘটনায় ২ জুলাই সিআইডি বাদী হয়ে লালবাগ থানায় মামলা করেছে। পাচারের শিকার নারীরা জবানবন্দিও দিয়েছেন। অভিযুক্ত ট্রাভেল এজেন্সি, বিদেশি এয়ার লাইনস ও গ্রেপ্তারের তথ্য পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আজমের মোবাইল ফোনে চাঞ্চল্যকর অডিও ক্লিপ আর ছবি

সিআইডি জানিয়েছে, আজম খানের কাছ থেকে যে মোবাইল জব্দ করা হয়েছে, তাতে শতাধিক নারীর বাঁচার আকুতি জানানো অডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে দালালদের তরুণী শিকার করা নিয়ে নিয়ে ফোনালাপ। এক অডিও ক্লিপে এক তরুণীকে নির্যাতন থেকে বাঁচতে আজম খানের সহায়তা চেয়ে আকুতি জানাতে শোনা যায়। অন্য একটি ক্লিপে শোনা যায় ৭ মাস ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ জানাতে।

You may also like

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More